BIGtheme.net http://bigtheme.net/ecommerce/opencart OpenCart Templates
সর্বশেষ
Home / জাতীয় / ধর্ষিত ছাত্রীকে বের করে দিল স্কুল কর্তৃপক্ষ

ধর্ষিত ছাত্রীকে বের করে দিল স্কুল কর্তৃপক্ষ

হবিগঞ্জ প্রতিনিধিঃ ধর্ষিত হওয়ার কারণে এক স্কুল ছাত্রীকে লেখাপড়া করতে দিচ্ছে না স্কুল কর্তৃপক্ষ। ধর্ষণের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর প্রায় পাঁচ মাস আগে তাকে স্কুলে যেতে বারণ করে দেন প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি।
সর্বশেষ গত ২৮ নভেম্বর বার্ষিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে গেলে মেয়েটিকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না দিয়ে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়। হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার নতুনবাজার শাহজালাল উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী এই পরিস্থিতির শিকার হয়েছে।ধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রী নিজে অপরাধী নয়, তার সঙ্গে অপরাধ করা হয়েছে। তাহলে স্কুল ছাত্রীর লেখাপড়া করা নিষেধ কেন—এমন প্রশ্ন করা হলে প্রধান শিক্ষক ও কমিটির সভাপতি দুজনই বললেন, অন্যান্য ছাত্রীর ওপর মেয়েটির প্রভাব পড়বে বলে ‘বৃহত্তর স্বার্থে’ তাকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় হুমকির মুখে পড়েছে মেয়েটির শিক্ষাজীবন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বাহুবল উপজেলার ভাদেশ্বর ইউনিয়নের চিচিরকোট গ্রামের ওই ছাত্রী স্থানীয় নতুনবাজার শাহজালাল উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে লেখাপড়া করে। দরিদ্র শ্রমজীবী পরিবারের ওই ছাত্রীর বাড়িতে পূর্ব পরিচয়ের সূত্রে আসা-যাওয়া ছিল পার্শ্ববর্তী হিমারগাঁও গ্রামের সিদ্দিক আলীর স্ত্রী ফাতেমা বেগমের। সে ছাত্রীকে ঢাকায় নিয়ে ভালো বেতনে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখায়।
গত ১৯ জুলাই সকালের দিকে ওই ছাত্রীকে ফুসলিয়ে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে আসে ফাতেমা বেগম। পরে তাকে তুলে দেয় একই উপজেলার যশপাল গ্রামের মৃত হোসেন আলীর ছেলে জাহির হোসেন ও আজগর আলীর ছেলে সামছুদ্দিনের হাতে।
তারা মেয়েটিকে নিয়ে সারা দিন একটি পিকআপ ভ্যানে করে বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরা করে। একপর্যায়ে বাহুবল উপজেলার মিরপুর বাজারে সানি ফার্নিচার মার্ট নামের দোকানে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে রাত্রী যাপনে বাধ্য করা হয়। রাতে ওই ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয়। পরদিন ওই ছাত্রীকে অন্যত্র পাচারের চেষ্টার সময় বাজারের পাহারাদারদের হাতে তারা আটক হয়।
এই ঘটনার পরদিন ২০ জুলাই নিপীড়িত স্কুল ছাত্রীর বাবা বাহুবল থানায় মামলা করেন। পুলিশ অভিযোগের প্রমাণ পেয়ে ধর্ষণে সহায়তাকারী ফাতেমা বেগম ও ধর্ষণে অভিযুক্তদের একজন জাহির হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর থেকে গ্রেপ্তারকৃতরা একাধিকবার জামিনের চেষ্টা করেও জামিন পায়নি। অন্য আসামি সামছুদ্দিন পলাতক রয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত শেষে পুলিশ গত ৮ নভেম্বর এই মামলায় হবিগঞ্জ নারী ও শিশু দমন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছেন। তবে ডিসেম্বর মাসে আদালত বন্ধ থাকায় অভিযোগ গঠন ও বিচার শুরুর অপেক্ষায় আছে মামলাটি। তবে সূত্র জানায়, আরেক আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি ও মালামাল ক্রোকের পরোয়ানাসহ আরো কিছু আইনি প্রক্রিয়া বাকি থাকায় অভিযোগ গঠনে বিলম্ব হতে পারে।
নিপীড়িত স্কুল ছাত্রীর বাবা বলেন, ‘ঘটনার পর আমি আমার মেয়েকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে চাইলে হেড মাস্টার আইয়ুব আলী আপাতত তাকে বিদ্যালয়ে না পাঠানোর পরামর্শ দেন। পরে আমার মুরব্বিসহ (সালিসি বিচারক) স্থানীয় লোকজন বিদ্যালয়ে যোগাযোগ করে। হেড মাস্টার তাদেরও একই পরামর্শ দেন। প্রধান শিক্ষকের পরামর্শ মতে আমি আমার মেয়েকে ঘটনার পর থেকে প্রাইভেট শিক্ষকের মাধ্যমে বাড়িতেই লেখাপড়া করিয়েছি। বার্ষিক পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসায় আমি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাকে জানান, বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি আমার মেয়েকে ছাত্রপত্র দিয়ে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই তাকে তিনি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দিতে পারছেন না। ’
স্থানীয় সালিসকারী (স্থানীয় ভাষায় মুরব্বি) অরুন চক্রবর্তী বলেন, ‘ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকে লেখাপড়া ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি স্থানীয় মুরব্বিদের নিয়ে বিদ্যালয়ে যোগাযোগ করেছি। প্রধান শিক্ষক আমাদের বলেছেন, ধর্ষিত ছাত্রীটিকে বিদ্যালয়ে যেতে দেওয়া হলে এর প্রভাব অন্য ছাত্রছাত্রীদের ওপর পড়বে। তাই বৃহত্তর স্বার্থে তাকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আইয়ুব আলী বলেন, ‘ঘটনার পরপরই বিদ্যালয়ের বৃহত্তর স্বার্থে ম্যানেজিং কমিটি ওই ছাত্রীটিকে ছাড়পত্র দিয়ে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই তাকে ২৮ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া বার্ষিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেওয়া যায়নি। ’ তিনি দাবি করেন, প্রকৃতপক্ষে এ বিষয়ে তার কিছুই করার ছিল না। বিষয়টা সম্পূর্ণ ম্যানেজিং কমিটির ব্যাপার।
বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হাশিম মিয়া বাহুবল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও ভাদেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। বর্তমানেও তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়। তিনি দাবি করেন, স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের চাপের মুখে তাঁরা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

Facebook Comments